নিম পাতা ও নিমের ডাল: প্রাকৃতিক ওষুধের এক আশ্চর্য গুণ

নিম আমাদের উপমহাদেশের একটি অতি পরিচিত ঔষধি গাছ। এর পাতা, ছাল, ফুল, ফল ও বীজ প্রায় সব অংশেই রয়েছে স্বাস্থ্য উপকারিতা। বিশেষ করে নিমপাতা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আয়ুর্বেদিক ও প্রাকৃতিক চিকিৎসায় ব্যবহার হয়ে আসছে। এতে রয়েছে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান, যা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার প্রতিকার ও প্রতিরোধে কার্যকর।

পাশ্চাত্যে নিম গাছকে ‘মিরাকল ট্রি’ বা অলৌকিক বৃক্ষ বলে। এই গাছ ‘ভিলেজ ফার্মেসী’ হিসাবে পরিচিত। নিম গাছের শিকড়, কান্ড, ডাল, পাতা, ফুল ও ফল-সবই মানুষের উপকারে লাগে।

নিম চাষ খুবই সহজ। শুধু রোপণ করলেই হয়। এর বংশবিস্তার বীজ দিয়ে এবং শাখা কলমের মাধ্যমে করা যায়। নিম গাছ সারা বছর রোপণ করা যায়। তবে উপযুক্ত সময় হচ্ছে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত। জুন-জুলাই মাসে বীজ সংগ্রহ করে ১০-১৫ দিনের মধ্যে বীজ বপন করতে হয় চারা উৎপাদন করার জন্য। চারার বয়স এক বছর হ’লে রোপণ করা যায়। প্রায় সব মাটিতে নিম ভাল হয়। স্বল্পকালীন বন্যা সহ্য করতে পারে। পোকামাকড় ও রোগবালাই দ্বারা আক্রান্ত হয় না। নিম গাছ দ্রুত বাড়ে।

নিম পাতার উপকারিতা

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

নিম পাতায় থাকা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করে। এটি শরীরকে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস থেকে রক্ষা করে। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।

চর্মরোগে উপকারী

নিমপাতা রক্ত পরিশোধন করে এবং শরীরের ভেতর থেকে ত্বক পরিষ্কার করে। ব্রণ, চুলকানি, একজিমা, দাগ-ছোপ ইত্যাদি চর্মরোগে নিম পাতা বিশেষ কার্যকর। এছাড়া নিম পাতা বেটে ত্বকে লাগালে তা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক

গবেষণায় দেখা গেছে, নিম পাতা শরীরে ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।

পেটের সমস্যা দূর করে

নিম পাতা খেলে হজমশক্তি বাড়ে, কৃমিনাশক হিসেবে কাজ করে এবং গ্যাস্ট্রিক, অম্বল, ডায়রিয়া ইত্যাদি সমস্যা কমায়।

লিভার পরিষ্কার রাখে

নিম পাতা লিভার ডিটক্সিফাই করতে সাহায্য করে, অর্থাৎ এটি লিভারের টক্সিন অপসারণ করে কার্যক্ষমতা বাড়ায়।

মাড়ি ও দাঁতের যত্ন

নিম পাতা চিবালে দাঁতের ব্যথা, মাড়ির ফোলাভাব, রক্ত পড়া ও দুর্গন্ধ দূর হয়। অনেক দাঁতের পেস্টেই নিম উপাদান ব্যবহার করা হয়।

চুল পড়া ও খুশকিতে উপকারী

নিম পাতার রস চুলে লাগালে খুশকি কমে, স্ক্যাল্পের ইনফেকশন দূর হয় এবং চুল পড়া হ্রাস পায়।

কীভাবে ও কতটুকু নিমপাতা খাওয়া উচিত

নিম পাতা কাঁচা খাওয়া যায়, আবার রস করেও খাওয়া যায়। তবে এর স্বাদ তিক্ত হওয়ায় অনেকেই রস করে পান করাকে বেশি পছন্দ করেন। প্রতিদিন ৫-৭ টি তাজা নিমপাতা খাওয়া সাধারণত নিরাপদ বলে ধরা হয়, বিশেষ করে যদি আপনি তা খালি পেটে সকালে খান।

কাঁচা নিম পাতা

কচি নিম পাতা ভালভাবে ধুয়ে চিবিয়ে খাওয়া যেতে পারে।

শাক হিসেবে

নিমপাতা শাকের মতো রান্না করে খাওয়া যায়।

নিমপাতার রস

 ৫-১০টি নিমপাতা পিষে বা ব্লেন্ড করে পানি ছেঁকে খালি পেটে ১ চামচ রস পান করা যেতে পারে।

নিম চা

নিমপাতা পানিতে সেদ্ধ করে সেই পানি ছেঁকে চায়ের মতো পান করলেও উপকার পাওয়া যায়।

শুকনা গুঁড়া

নিমপাতা ভালোভাবে শুকিয়ে গুঁড়া করে ভাতের সঙ্গে অথবা পানির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে।

আধুনিক গবেষকগণ নিমকে নানাভাবে ব্যবহার করছেন।

(১) এ গাছের আঠা কেমিক্যাল শিল্পের কাঁচামাল ও রেশম কাপড়ের রং হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

(২) নিম বীজের তেল ব্যাপকভাবে প্রসাধন শিল্পে এবং সাবান ও কীটনাশক হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

(৩) নিমের তেল এমনকি রকেটের জ্বালানীতে রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়েছে।

(৪) নিমের পাতার রস ঘা, ফোঁড়া, চুলকানি, চর্মরোগ, গুটি বসন্ত, খোস-পাঁচড়া, পানি বসন্ত, হাম, ব্রণ, জ্বর, সর্দি-কাশি, অরুচি, বদহযম, কৃমি, কফ, বমি, কুষ্ঠ, হিক্কা, প্রমেহ রোগ সারায়।

(৫) নিমের বীজের তেল মাথা ঠান্ডা রাখে, উঁকুন মারে, চুল বাড়ায়, চুলপড়া বন্ধ করে, খুশকি দূর করে।

(৬) নিমের বাকল বাতরোগ ও জ্বরে খুব উপকারী।

(৭) নিম গাছের ডাল দিয়ে প্রতিদিন দাঁত মাজলে দাঁতের রোগ হয় না ও মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়।

(৮) নিমের আঠা ও ফল থেকে শক্তিবর্ধক টনিক তৈরী হয়।

(৯) কাঁচা হলুদ ও নিমপাতা বাঁটা বসন্তের গুটিতে দিলে গুটি দ্রুত শুকিয়ে যায়।

(১০) ১০টি পাতা ও ৫টি গোল মরিচ একত্র চিবিয়ে খেলে রক্তের শর্করা কমিয়ে ডায়বেটিস রোগীদের উপকার করে।

(১১) নিম বীজের তেল দিয়ে প্রায় ২০০ প্রজাতির ক্ষতিকারক পোকামাকড় দমন করা যায়। গুদামের শস্যের মধ্যে নিমপাতা গুঁড়া করে দিলে পোকা আক্রামণ করে না। মশা দমনের জন্য নিমের তেল খুব কার্যকরী।

(১২) নিম বীজের খৈল গবাদি পশুর খাদ্য ও সার হিসাবে জমিতে প্রয়োগ হয়।

(১৩) নিম গাছের কাছে মশা যায় না। নিম তেল দ্বারা তৈরী কেরোনিম লিকুইড ১০ মিলিলিটারে ১ লিটার মিশিয়ে মশার উৎপত্তি স্থানে স্প্রে করলে মশা নির্মূল হয়।

(১৪) ইউরিয়া সারের সাথে নিম পাউডার মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করলে ২৫ ভাগ ফলন বেশী হয়।

(১৫) নিমের গুঁড়া উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদান মাটিতে সংরক্ষণ করে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়াও মাটির ক্ষতিকারক পোকামাকড় ধ্বংস করে।

(১৬) আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) পরীক্ষা করে দেখেছে যে, নিমের খৈল ধানের সহজলভ্য এমোনিয়াম নাইট্রোজেনকে নাইট্রেটে রূপান্তরিত করে, যা মাটিকে নাইট্রেট লবণমুক্ত করতে সাহায্য করে।

(১৭) নিম গাছ ভূমিক্ষয় রোধ করে তামপাত্রা কমায়।

(১৮) নিমের তেল দিয়ে বাতি জ্বালানো যায়।

(১৯) বীজের মন্ড দিয়ে মিথেন তৈরী করা যায়।

(২০) পাতার গুঁড়া দিয়ে ফেসক্রিম এবং তেল দিয়ে বিভিন্ন কসমেটিক্স তৈরী হচ্ছে, যার কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।

(২১) নিমের টুথপেস্ট, সাবান, তেল, লোশন, শ্যাম্পু বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে।

(২২) নিমের কাঠ খুব উন্নতমানের। এতে ঘুণ ধরে না। নিম কাঠে গৃহ নির্মাণ, আসবাবপত্র তৈরী, নৌকা ও জাহায নির্মাণ করা যায়।

নিমের ডাল দাঁতের যেসব উপকার করে

– দাঁতের যেকোনো অংশ ফুলে ওঠা রোধ করে।
– মাড়ি শক্ত করে
– মুখের দুর্গন্ধ দূর করে
– দাঁতের সাদা রং অপরিবর্তিত রাখে।

নিমের ডাল ব্যবহারে সতর্কতা

  • নিমডাল ব্যবহারের আগে খুব ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
  • গাছের ডালকে অবশ্যই ভালো করে ভেঙে ব্যবহার করতে হবে।
  • নিমডালে দাঁত মাজার আগে সরিষার তেল ও লবণ দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা বাঞ্ছনীয়।

নিমের ক্ষতিকর ব্যবহার :

(১) নিম প্রাচীনকাল থেকেই গর্ভনিরোধক হিসাবে ব্যবহৃত হয়। তাই গর্ভাবস্থায় বা সন্তান নিতে ইচ্ছুক হ’লে নিমের  তেল বা নিম পাতা থেকে তৈরি ট্যাবলেট এড়িয়ে চলা উচিৎ। এটা উর্বরতা কমায় ও গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ায়।

(২) এটি রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। তাই যাদের নিম্ন রক্তচাপ রয়েছে তারা নিমের ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।

(৩) অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ডায়াবেটিস এড়াতে নিম পাতা বা নিমের রস পান করা শুরু করেন। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষরা নিমের রস বেশি পান করলে তা ওষুধের পরিবর্তে বিষ হিসাবে কাজ করতে পারে। এর ফলে স্পার্ম কাউন্ট সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হ’তে পারে।

(৪) এছাড়া আপনার শরীরে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী টানা কতদিন নিম পাতা খাওয়া যেতে পারে সেটা একজন বিশেষজ্ঞের থেকে জেনে নেওয়া উচিত। কারণ একনাগাড়ে এটি খেতে থাকলে শরীরের নানা ক্ষতি দেখা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *