হীরা শিল্পের প্রতারণা ও গোপন রহস্য

——————————————————————————–

১. হীরা মোটেও দুর্লভ নয়, এর সংকট পুরোটাই কৃত্রিম

হীরাকে যতটা দুর্লভ মনে করা হয়, বাস্তবে এটি ততটা দুর্লভ নয়। প্রকৃতিতে অন্যান্য মূল্যবান পাথরের মতোই হীরা বিপুল পরিমাণে বিদ্যমান। তাহলে এর দাম এত বেশি কেন? এর পেছনের মূল কারণ হলো একটিমাত্র কোম্পানির বাজার নিয়ন্ত্রণ।

গত ১০০ বছর ধরে “De Beers” নামের একটি কোম্পানি একাই বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ হীরার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো খনি থেকে হীরার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং দাম সবসময় আকাশছোঁয়া থাকে।

এই কৃত্রিম সংকট কতটা প্রকট তার একটি উদাহরণ হলো রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় হীরার ভান্ডার, যার নাম “আলমাজনি ফন্ড”। শুধু এই একটি ভান্ডারেই এত পরিমাণ হীরা মজুদ আছে যে, তা দিয়ে পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষকে একটি করে হীরার আংটি দেওয়ার পরেও বিপুল পরিমাণ হীরা অবশিষ্ট থাকবে। এই একটি তথ্যই দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, হীরার উচ্চমূল্যের কারণ এর প্রাকৃতিক স্বল্পতা নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত প্রতারণা।

২. “ডায়মন্ড ইজ ফরএভার”: আপনার আবেগের দাম নির্ধারণ করেছে একটি বিজ্ঞাপন

বাজারের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা ছিল এই খেলার অর্ধেক। আসল খেলাটি ছিল আপনার মনকে নিয়ন্ত্রণ করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন আমেরিকার অর্থনীতি সমৃদ্ধিশালী এবং মধ্যবিত্ত সমাজে বিয়ে ও রোমান্টিকতার এক নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠছিল, ঠিক তখনই De Beers তাদের বিখ্যাত বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করে।

তাদের সেই অবিস্মরণীয় স্লোগান ছিল “A Diamond Is Forever” (হীরা হলো চিরন্তন)। এই একটি লাইন আমেরিকান সমাজের মনস্তত্ত্বে এতটাই গভীরভাবে গেঁথে যায় যে, তখন থেকেই প্রেমিকের ভালোবাসা, স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদা এবং বিয়ের প্রস্তাবের মতো আবেগীয় সম্পর্কগুলো হীরার মূল্যে পরিমাপ করা হতে থাকে। নারীদের মনের গভীরে এই বিশ্বাস ঢুকে যায় যে, পুরুষ যত দামী হীরা দেবে, সে তত বেশি ভালোবাসে।

অর্থনীতিবিদরা বলেন ডি বিয়ার্সের সেই বিপনন কৌশল ছিল বিশ্বের সবচেয়ে সফল মনস্তাত্বিক বিজ্ঞাপন।

এভাবেই একটি সাধারণ রত্নপাথরকে মানুষের ভালোবাসা পরিমাপের এককে পরিণত করা হয়, যার প্রভাব আজও বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান।

৩. আসল-নকলের পার্থক্য অসম্ভব: আপনার হীরাটি ল্যাবে তৈরি হতে পারে

প্রাকৃতিকভাবে হীরা তৈরি হতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লাগে। মাটির প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটার গভীরে ১২০০-১৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলের চেয়ে প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৭০,০০০ গুণ বেশি চাপে কার্বন পরমাণুগুলো ধীরে ধীরে হীরার স্ফটিকে রূপান্তরিত হয়।

কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, বিজ্ঞানীরা এখন গবেষণাগারে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে একই গুণমানসম্পন্ন হীরা তৈরি করতে সক্ষম। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, প্রাকৃতিক এবং ল্যাবে তৈরি হীরার পারমাণবিক গঠন ও আলোর প্রতিফলন হুবহু একই। ফলে অভিজ্ঞ রত্নবিশেষজ্ঞরাও এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারেন না। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ল্যাবে তৈরি হীরা প্রাকৃতিক হীরার চেয়েও বেশি নিখুঁত হতে পারে।

প্রাকৃতিক হীরার প্রধান নিয়ন্ত্রক De Beers এখন “Lightbox” নামে নিজেদের ব্র্যান্ডের অধীনে ল্যাবে তৈরি হীরাও বিক্রি করছে। De Beers-এর মতো একটি প্রতারক কোম্পানি যে তাদের মূল ব্র্যান্ডের অধীনে নকল হীরা বিক্রি করছে না, সেই নিশ্চয়তা কে দেবে?

৪. বিশ্বের ৯০% হীরা একটি শহরেই নকলের সাথে মেশানো হয়

আপনি জেনে অবাক হবেন যে, বিশ্বের ৯০ শতাংশ হীরা, তা প্রাকৃতিক হোক বা ল্যাবে তৈরি, ভারতের গুজরাট রাজ্যের সুরাট শহরে কাটা এবং পলিশ করা হয়। কাঁচা বা অপরিশোধিত হীরার তেমন কোনো আর্থিক মূল্য নেই। সুরাটের হাজার হাজার “ডায়মন্ড ইউনিট”-এ দক্ষ কারিগরদের হাতে পলিশ হওয়ার পরই এটি সেই চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বলতা লাভ করে।

আর এখানেই ঘটে সবচেয়ে বড় কারসাজি। হীরার বড় বড় কর্পোরেশনগুলো সুরাটেই প্রাকৃতিক হীরার চালানের সাথে কৃত্রিম বা নকল হীরা মিশিয়ে দেয়। একবার এই মিশ্রণটি সুরাট থেকে বেরিয়ে গেলে, কোনটি আসল আর কোনটি নকল, তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। খোদ গুজরাট সরকারের তথ্য অনুসারেই, সেখানে ৩০০টির বেশি ল্যাবে হীরা তৈরির কারখানা রয়েছে, যদিও বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়।

৫. এই প্রতারণার জাল বিস্তৃত বাংলাদেশ পর্যন্ত

হীরার এই প্রতারণার জাল শুধু বিদেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় অলংকার বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান “ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড”-এর বিরুদ্ধে হীরার নামে কাঁচের টুকরা বিক্রির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানটি বিগত পাঁচ বছর কোনো হীরা আমদানি না করেই ঢাকা সহ সারাদেশে তাদের ২৮টি শোরুমের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার নকল হীরার গহনা বিক্রি করেছে। এই ঘটনার ভয়াবহতা আরও বেড়ে যায় যখন জানা যায় যে, এর মালিক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প বাণিজ্য উপ-কমিটির সদস্য ছিল এবং তার বিরুদ্ধে ছাত্র হত্যা মামলার মতো অভিযোগও রয়েছে। এটি প্রমাণ করে, হীরার বাজারের এই প্রতারণা কতটা গভীরে প্রবেশ করেছে এবং সাধারণ ক্রেতারা কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

——————————————————————————–

উপরের তথ্যগুলো থেকে এটি স্পষ্ট যে, হীরার যে আকাশছোঁয়া মূল্য এবং মর্যাদা, তা এর অন্তর্নিহিত কোনো গুণের জন্য নয়। বরং এটি একটি পরিকল্পিত বিভ্রান্তি যা কৃত্রিম সংকট, মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞাপন এবং বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত এক প্রতারণার নেটওয়ার্কের উপর দাঁড়িয়ে আছে।

এই সত্যগুলো জানার পর, আপনি কি আর কখনো হীরাকে আগের চোখে দেখতে পারবেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *