প্রাচীন মিশরের ৭০০০ বছরের দীর্ঘ ইতিহাস আর গিজার পিরামিড যুগ যুগ ধরে আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছে। সেই প্রাচীন সভ্যতার আত্মাকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে জীবন্ত করে তুলতে পিরামিডের পাশেই নির্মিত হয়েছে গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম (GEM)—শুধু একটি জাদুঘর নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি আর বিজ্ঞানের এক মহাকাব্যিক মেলবন্ধন।
——————————————————————————–
১. ৮০টি ফুটবল মাঠের সমান বিশাল এক জগৎ
গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়ামের বিশালতা কল্পনাকেও হার মানায়। এর আয়তন প্রায় ৫ লক্ষ বর্গমিটার, যা প্রায় ৮০টি ফুটবল মাঠের সমান। প্রায় দুই দশক ধরে নির্মিত এই বিশাল প্রকল্পের পেছনে খরচ হয়েছে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি, যার বেশিরভাগ অর্থায়ন এসেছে জাপানের উন্নয়ন ঋণ থেকে। মিশরের হাজার হাজার বছরের অমূল্য ঐতিহ্যকে এক ছাদের নিচে সুরক্ষিতভাবে তুলে ধরার জন্যই এমন বিশাল পরিসরের প্রয়োজন ছিল।
২. প্রথমবারের মতো তুতেনখামুনের সম্পূর্ণ ধনভান্ডার এক ছাদের নিচে
এই জাদুঘরের প্রধান আকর্ষণ হলো বালক রাজা তুতেনখামুনের সমাধির সম্পূর্ণ ধনভান্ডার। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তাঁর কবর থেকে উদ্ধার হওয়া ৫,০০০-এরও বেশি প্রত্নবস্তু একসঙ্গে প্রদর্শন করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তাঁর আইকনিক সোনার মুখোশ, রাজকীয় পোশাক, আসবাবপত্র এবং এমনকি তাঁর ছেলেবেলার খেলনাও, যা দর্শকদের ইতিহাসের সাথে ব্যক্তিগতভাবে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ করে দেয়।
৩. ২০,০০০ প্রত্নবস্তু যা আগে কখনো আলোর মুখ দেখেনি
জাদুঘরটিতে প্রায় এক লক্ষেরও বেশি প্রত্নবস্তু সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২০,০০০ প্রত্নবস্তু আগে কখনো জনসাধারণের সামনে প্রদর্শন করা হয়নি। এর অর্থ হলো, এমনকি মিশরীয় ইতিহাসের বিশেষজ্ঞরা এখানে এসেও নতুন কিছু আবিষ্কার করার সুযোগ পাবেন। প্রতিটি পরিদর্শনই হয়ে উঠবে অদেখা ইতিহাসের গভীরে এক অনন্য যাত্রা।
৪. এটি শুধু জাদুঘর নয়, ইতিহাস রক্ষার এক গবেষণাগার
গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম শুধু প্রত্নবস্তু প্রদর্শনের স্থান নয়, এটি একটি বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সংরক্ষণ কেন্দ্রও। এখানে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম উন্নত কনজারভেশন ল্যাবরেটরি, যেখানে ১২০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ এবং এক হাজারেরও বেশি কর্মী প্রাচীন নিদর্শনগুলোর পুনর্গঠন ও সংরক্ষণে কাজ করছেন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো, হাজার হাজার বছরের পুরোনো এই প্রত্নবস্তুগুলো যেন অন্তত আরও ১০০ বছর নিরাপদে টিকে থাকতে পারে তা নিশ্চিত করা।
৫. স্থাপত্য যা অতীত আর ভবিষ্যৎকে এক করেছে
এই জাদুঘরের স্থাপত্যশৈলী নিজেই একটি বিস্ময়। ভেতরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় ফারাও দ্বিতীয় রামেসিসের প্রায় ৩০ ফুট উঁচু এবং ৮০ টন ওজনের এক বিশাল মূর্তি—যা ৩২০০ বছরের পুরোনো মিশরীয় সভ্যতার শক্তি ও অগ্রগতির প্রতীক। এরপর চোখে পড়ে ছয়তলা জুড়ে বিস্তৃত এক ‘গ্র্যান্ড স্টেয়ারকেস’, যার ধাপে ধাপে সাজানো রয়েছে প্রাচীন রাজা ও দেব-দেবীর ৫৯টি মূর্তি, যা দর্শকদের ইতিহাসের গভীরে নিয়ে যায়।
এর পাশাপাশি, জাদুঘরটি বিশেষ জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্মিত, যা প্রায় ৬০% পর্যন্ত শক্তি সাশ্রয় করে। এর বিশাল কাঁচের দেয়াল দিয়ে মাত্র এক মাইল দূরে অবস্থিত গিজার পিরামিডের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়, যা প্রাচীন ও আধুনিক বিশ্বের মধ্যে একটি রূপক সেতু তৈরি করেছে। যেমনটি মিশরের প্রেসিডেন্ট বলেছেন:
“জাদুঘরটি মিশরের পক্ষ থেকে বিশ্ববাসীর জন্য উপহার।”
——————————————————————————–
গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম কেবল একটি ভবন নয়; এটি রহস্যময় ইতিহাসের এক বিশাল সিন্দুক, যা আধুনিক প্রযুক্তির চাবি দিয়ে নতুন করে খোলা হয়েছে। এই মহাপ্রকল্প আমাদের মনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়: প্রাচীন সভ্যতার আরও কত রহস্য আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে বলে আপনি মনে করেন?