সুদানের অভিশাপ: যে ৫টি চাঞ্চল্যকর সত্য সোনা পাচার এবং গৃহযুদ্ধকে এক সুতোয় বাঁধে

১. সোনার পাহাড়ে দারিদ্র্যের বাস: এক অবিশ্বাস্য বৈপরীত্য

বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম সোনা উৎপাদনকারী হওয়া সত্ত্বেও, জিডিপির দিক থেকে সুদান পৃথিবীর ১৭তম দরিদ্র দেশ। দেশটির অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিই হলো খনিজ সম্পদ। সুদানের ৮৫ শতাংশ শিল্প স্বর্ণকেন্দ্রিক এবং দেশটির মোট রপ্তানি আয়ের ৭০ শতাংশই আসে সোনা থেকে। কিন্তু এই বিপুল ঐশ্বর্যের ছিটেফোঁটাও দেশটির সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজে আসে না।

এই বৈপরীত্যের মানবিক মূল্য অত্যন্ত ভয়াবহ। দেশটির প্রায় অর্ধেক জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করাও সুদানের অধিকাংশ মানুষের জন্য এক ধরনের বিলাসিতা। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশের জন্য এটি এক নির্মম বাস্তবতা।

২. আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ: যেভাবে সোনা গৃহযুদ্ধের জ্বালানি যোগাচ্ছে

সুদানের সোনা থেকে অর্জিত মুনাফা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বা জনগণের কল্যাণে ব্যয় হয় না। দেশটির বেশিরভাগ সোনার খনি নিয়ন্ত্রণ করে সেনাবাহিনী, র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF)-এর মতো মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিকদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা। ফলে বিপুল পরিমাণ সম্পদ চলে যায় ব্যক্তিগত তহবিলে।

এর প্রত্যক্ষ পরিণতি হলো, এই সোনা অবৈধভাবে বিদেশে বিক্রি করে সেই টাকায় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কেনা হয়, যা দশকের পর দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধে সরাসরি জ্বালানি যোগাচ্ছে। সুদানের মূল সংঘাতটিই হলো দেশের খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণের লড়াই। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সুদানের অবৈধ সোনা উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, কারণ সংঘাত যত বাড়ে, অস্ত্রের প্রয়োজনও ততটাই বৃদ্ধি পায়।

সুদানের জনগণের জন্য সোনা আশীর্বাদ নয় বরং অভিশাপে পরিণত হয়েছে।

৩. দুবাইয়ের ‘গোল্ড ওয়াশিং মেশিন’: যেভাবে অবৈধ সোনা বৈধ হয়

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম প্রধান “গোল্ড হাব” বা স্বর্ণ ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এর একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুবাইয়ের স্বর্ণ আমদানির অন্তত ৪০ শতাংশের উৎস পরিষ্কার নয় এবং এর একটি বড় অংশই আসে সুদান, কঙ্গো ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলো থেকে।

অবৈধ সোনা বৈধ করার প্রক্রিয়াটি অবাক করার মতো সহজ। চোরাচালান করা সোনা দুবাইয়ে পৌঁছানোর পর সেখানকার রিফাইনারিতে গলিয়ে ফেলা হয়। এরপর সেটিকে “দুবাই রিফাইনড গোল্ড” হিসেবে নতুন সার্টিফিকেট দেওয়া হয়, যা কার্যকরভাবে সোনার অবৈধ উৎসকে মুছে ফেলে। পাইকারি ক্রেতারাও সাধারণত এই সোনার উৎস যাচাই করে না, ফলে অবৈধ স্বর্ণ খুব সহজেই বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে।

৪. চোরাচালানের সুপারহাইওয়ে: কল্পনার চেয়েও সহজ পাচার পদ্ধতি

সুদান থেকে সোনা পাচারের পথটি বেশ সুসংগঠিত। খনি অঞ্চল থেকে সোনা সংগ্রহ করে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে তা রাজধানী খারতুমে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে কার্গো বা ব্যক্তিগত বিমানে করে সরাসরি অথবা পার্শ্ববর্তী দেশ চাদ ও মিশরের মাধ্যমে গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাচার করা হয়।

এই চোরাচালানের সবচেয়ে প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক হলো মিলিশিয়া গোষ্ঠী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF)। তারা সরকারি তদারকি এড়াতে সামরিক ঘাঁটি বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের এয়ারস্ট্রিপ ব্যবহার করে চালান পাঠায়। অনেক ক্ষেত্রে, কাস্টমস কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হয়, যার ফলে এই বিপুল পরিমাণ সোনার কোনো রপ্তানি নথিই থাকে না।

৫. রক্তের অর্থনীতি: খনিজ সম্পদের জন্য গণহত্যা

সুদানের বর্তমান গৃহযুদ্ধটি মূলত সেনাবাহিনী এবং RSF-এর মধ্যে দেশের খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণের এক ভয়াবহ লড়াই। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৫,০০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই সংঘাতের মূলে রয়েছে সোনার অবৈধ ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ।

এর সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো, RSF-এর বিরুদ্ধে সোনা সমৃদ্ধ এলাকাগুলোতে জাতিগত নিধন এবং গণহত্যা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এর পেছনের যুক্তি অত্যন্ত নৃশংস: কারণ এলাকাগুলো জনশূন্য হয়ে গেলে খনিজ সম্পদ লুণ্ঠনের পথে আর কোনো বাধা থাকবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *